[ad_1]
‘বাংলাদেশে উন্নতমানের কাঁচাপাটের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় পাট ও বহুমুখী পাটপণ্য খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক বাজারের উদীয়মান সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না আমরা।’
এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে জাতীয় বাজেটে দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ রাখা এবং বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও পণ্যের বহুমুখীকরণে সহায়ক বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বহুমুখী পাটজাতপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. রাশেদুল করীম মুন্না।
আগামী অর্থবছরে পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সে বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
আমাদের মূল প্রত্যাশা জুট ডাইভার্সিফায়েড প্রোডাক্ট (পাটজাত বহুমুখী পণ্য) খাতকে বাস্তবভিত্তিক নীতিসহায়তা দেওয়া। বর্তমানে আমরা স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল কিনলেও সোর্স ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। আবার আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের ট্যাক্স ও জটিলতা রয়েছে। ফলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি আনা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক মার্কেটিং—সবকিছু উদ্যোক্তাদের নিজেদের খরচে করতে হচ্ছে। এসব ব্যয়ের বিপরীতে যদি সরকার ট্যাক্স বেনিফিট বা বিশেষ প্রণোদনা দেয়, তাহলে খাতটি দ্রুত এগোতে পারবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা ও ট্যাক্স কাঠামো। আমরা যেসব কাঁচামাল ব্যবহার করি, তার একটি অংশ আমদানি করতে হয়। কিন্তু এগুলোর ওপর ট্যাক্স ও ভ্যাট যোগ হওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক থাকে না।
আরও পড়ুন
আইএমএফের শর্তে রাজস্বে চাপ, তৈরি হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট
বাজেটের দর্শন অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ, অগ্রাধিকার পাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী
আসছে ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট, কর্মসংস্থান-মূল্যস্ফীতিতে নজর
আরেকটি সমস্যা হলো বন্ড সুবিধা বাস্তবে কার্যকর না হওয়া। কাগজে-কলমে সুযোগ থাকলেও রিফান্ড প্রক্রিয়া এত জটিল যে উদ্যোক্তারা সেটি ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না।
আমি মনে করি, সরকার চাইলে একটি ডিজিটাল অ্যাপভিত্তিক সিস্টেম চালু করতে পারে। যেখানে একজন রপ্তানিকারক কোন কাঁচামাল কিনছে, কতটুকু ব্যবহার করছে এবং কতটুকু রপ্তানি করছে— সব তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। ভারতের মতো দেশে এ ধরনের সিস্টেম রয়েছে। এতে ট্যাক্স রিটার্ন ও ট্যাক্স ব্যাক প্রক্রিয়া সহজ হয়।
বাংলাদেশেও যদি এমন একটি স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে হাজার হাজার উদ্যোক্তা সহজে সুবিধা পাবে।
আমাদের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এখনো দুর্বল। বিদেশি মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া খুব ব্যয়বহুল। কিন্তু এসব প্ল্যাটফর্মে অংশ নিতে না পারলে নতুন বাজার তৈরি করা সম্ভব নয়।
সরকার যদি আন্তর্জাতিক ফেয়ার, মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আংশিক ভর্তুকি দেয়, তাহলে আগামী দু-তিন বছরের মধ্যেই আমাদের রপ্তানি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে আমাদের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পাট কাঁচাপাট বা সুতা আকারে রপ্তানি হচ্ছে। পরে অন্য দেশ সেটি ফিনিশড প্রোডাক্টে রূপান্তর করে বেশি আয় করছে।
ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য তৈরি করতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বুঝতে হবে। সেই অনুযায়ী ডিজাইন, কাঁচামাল ও প্রযুক্তি উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও ডিজাইন সাপোর্ট সেন্টার গড়ে ওঠেনি।
আমরা চাই সরকার আন্তর্জাতিক মানের একটি গবেষণা ও ডিজাইন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করুক। পাশাপাশি বিদেশি ডিজাইনার বা বিশেষজ্ঞ আনার ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া হোক।
এ খাতে দক্ষ জনবল বড় সংকট। গার্মেন্টস খাতের মতো এখানে এখনো দক্ষ কর্মী, ম্যানেজমেন্ট বা প্রশিক্ষিত ওয়ার্কফোর্স তৈরি হয়নি। উদ্যোক্তাদের নিজেদের উদ্যোগে কর্মীদের ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দিতে হয়। এরপর অনেকেই অন্য খাতে চলে যায়।
সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব চাহিদাভিত্তিক নয়। আমরা চাই, বাজার ও প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম পরিচালিত হোক।
ভবিষ্যতে কৃষক যেন পাটচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়, সেজন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, উন্নতমানের বীজ উদ্ভাবন জরুরি। যেমন ধানের ক্ষেত্রে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে, পাটেও তেমন গবেষণা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, পাট পচানো বা রেটিং প্রক্রিয়া আধুনিক করতে হবে। বর্তমানে পানি সংকট, অতিবৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা সমস্যায় পড়ছেন।
তৃতীয়ত, কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পায়, সেজন্য একটি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভারতের মতো উৎপাদন খরচের সঙ্গে নির্দিষ্ট মুনাফা যোগ করে সরকার মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। এতে কৃষক ও মিল—দুই পক্ষই উপকৃত হবে।
আমি বিশ্বাস করি, সঠিক নীতিসহায়তা পেলে জুট ডাইভার্সিফায়েড প্রোডাক্ট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হতে পারে।
এটি শুধু একটি শিল্পখাত নয়, পুরো সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে যুক্ত—কৃষক, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, রপ্তানিকারক সবাই এর অংশ। তাই বাজেটে গবেষণা, কাঁচামাল, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, প্রযুক্তি, মার্কেটিং ও রপ্তানি সহায়তার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
বিশ্বব্যাপী অনলাইন প্ল্যাটফর্মভিত্তিক ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ক্ষুদ্র পরিসরে অনলাইন এক্সপোর্টের জন্য সহজ পেমেন্ট গেটওয়ে ও নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়নি।
ধরুন কেউ দুই বা পাঁচটি পণ্য বিদেশে বিক্রি করতে চায়, সেখানেও তাকে পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি ডকুমেন্টেশন করতে হচ্ছে। এতে ছোট উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন। অথচ এই ডলার তো বাংলাদেশেই আসছে। তাই এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অনলাইন এক্সপোর্ট গেটওয়ে চালু করা জরুরি।
আইএইচও/এএসএ/এমএফএ
[ad_2]
Source link