[ad_1]
আমার কান তো নিরপরাধ। আমার কান ২৩ বছর ধরে রঙের নাম শুনেছে, রবীন্দ্রসংগীত শুনেছে, বিটলস শুনেছে, পিংক ফ্লয়েড শুনেছে, বৃষ্টি শুনেছে। অপরাধী তো তাদের কান, যারা ওই খোলা দরজা দিয়ে বছরের পর বছর শুধু বাতিল সস্তা জিনিস ঢুকিয়েছে। ধার করা গান, ধার করা মতবাদ, ধার করা মেকি হাসি-কান্না, অন্যের বানানো ১৫ সেকেন্ডের অর্থহীন সংলাপ। যাদের গুদামে নিজের বলতে একটা শব্দও নেই, কান জিনিসটা ওদের কাছে অপচয়। আর অপচয়ের জিনিস কেড়ে নেওয়াকে চুরি বলে না, বলে উদ্ধার।
সেই রাতে আমি খুরটা ধুয়ে তুলে রাখলাম, নিজের জন্য নয়।
কান কীভাবে নিই, সেই প্রশ্নটা করবেন না। শিল্পীর টেকনিক শিল্পীর সম্পদ। এটুকু জানেন, আমার হাত সার্জনের চেয়ে স্থির, কারণ আমি ২৩ বছর শূন্য দশমিক ৩ মিলিমিটারের তুলি টেনেছি। আর এটুকু জানেন, ওরা কেউ মরে নাই, একজনও না। আমি কসাই নই, আমি সংগ্রাহক। মিউজিয়াম মমি রাখে, আমি রাখি কান। শহরে এখন ১১ জন মানুষ চুল লম্বা রেখে ঘোরে, বাঁ দিকটা ঢেকে। পুলিশ বলে কানকাটা চক্র, পত্রিকা নাম দিয়েছে কানকাটা ভ্যান গঘ। মূর্খের দল। ওরা ভাবছে আমি কান কেনাবেচা করি।
প্রতিটি কাজ আমি করেছি শিল্পীর নিয়মে। তাড়াহুড়া নাই, রাগ নাই, একটা অতিরিক্ত আঁচড় নাই। কসাইয়ের সঙ্গে শিল্পীর পার্থক্য জানেন? কসাই শুধু মাংস কাটার কাজ শেষ করে। শিল্পী কাজ সম্পূর্ণ করে।
আগে আসত প্রস্তুতি। যাকে নেব, তাকে আমি আগে শুনতাম, সপ্তাহের পর সপ্তাহ। তার রুটিন, তার মোবাইলে কী বাজে, তার কণ্ঠে কার কথা। ক্যানভাস না চিনে কেউ তুলি ধরে না। তারপর সেই রাতে, কাজের আগে, আমি তাদের ঘুমটা নিশ্চিত করতাম।
কিন্তু ব্যথা একেবারে না দিলে তো ঠকানো হয়। সত্য আর্ট ব্যথা ছাড়া হয় না, এই শিক্ষাটাই তো দিতে বের হয়েছি। তাই ব্যথাটুকু আমি দিতাম মেপে, আমার নিজস্ব সিগনেচার টাচে। ২৩ বছরে একটা গ্যালারি আমাকে দেয়াল দেয় নাই। আমি নিজের গ্যালারি নিজে বানিয়ে নিয়েছি।
তারপর কাজ শেষে ধোয়ামোছা, ওষুধ, ব্যান্ডেজ—সব নিয়মমতো। আমার একটা ক্যানভাসেও ইনফেকশন হয় নাই, এই রেকর্ড যেকোনো সার্জারি ওয়ার্ডের চেয়ে ভালো এবং সবার শেষে, যাওয়ার আগে আমার গুরু ভ্যান গঘের চিত্রকর্ম। যেখানে কানটা ছিল, সেই জায়গাটার চারপাশের চামড়ায় আমি এঁকে দিয়ে আসতাম একটা ছোট্ট ঘূর্ণি—তারাভরা রাতের সেই পাক খাওয়া আকাশ, দুই ইঞ্চিতে। ভ্যান গঘ সব ছবিতে সই করতেন না, জানেন তো। যে কাজটাকে উনি সম্পূর্ণ মনে করতেন, খালি সেইটাতে লিখতেন, ভিনসেন্ট। পদবি নয়, খালি নামটা। আমিও তা–ই। প্রতিটি কানের লতিতে, এত মিহি করে যে আতশি কাচ লাগে পড়তে, আমি লিখে দিতাম একটাই শব্দ—ভিনসেন্ট।
এখানে এসে আপনি হয়তো আমাকে পাগল ভাববেন। ভাবেন, ক্ষতি নাই। ভ্যান গঘকেও
সবাই ভাবত।
আর হ্যাঁ, আমার বাছাইয়ের একটা নীতি ছিল। শক্ত নীতি। রিকশাওয়ালা ছেলে যখন ভাইরাল গানে ঠোঁট মেলায়, ওইটা তার একমাত্র বিনোদন। গার্মেন্টসের মেয়ে যখন নকল ডিজাইন তোলে, ওইটা তার ভাত। পেটের দায়ের নকল আমার আদালতে মাফ। ওইটা অপরাধ নয়, বেঁচে থাকার লড়াই। বেশির ভাগ মানুষের কাছেই আজকাল নকল আরামের, আসল লাগে ব্যথার। মানুষ আরামটা বেছে নেয়, তারপর সারা জীবন
ব্যথায় থাকে।
আমার লিস্টে উঠত অন্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা, যারা ঠিক ভ্যান গঘের ছেড়ে যাওয়া বন্ধুর মতো। ব্যাংকের ম্যানেজারের কন্যা, যে বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে এসে অন্যের কবিতা, ছবি, ভিডিও নকল করে তার সঙ্গে নেচে নিজের পেজে পোস্ট করে। শিল্পপতির বউ, যে এআই দিয়ে আর্ট বানিয়ে গ্যালারি ভাড়া করে একক প্রদর্শনী করে, উদ্বোধনে মন্ত্রী আসে।
দুনিয়ার সব দরজা খোলা পেয়েও এরা নিজের একটা শিল্প বানায়নি। তাই আমার খুর কোনো দিন ক্ষুধার্ত কান ছোঁয় নাই। আমি খালি শিকার করতাম সচ্ছল কান।
কাটা কান ফরমালিনে রাখলে সে মরে না। সে বাজে। রাত দুইটার পরে, ঘর যখন নিস্তব্ধ, বয়ামগুলো চালু হয়। প্রতিটি কান তার গুদামের মাল ফেরত দেয়, স্তরের পর স্তর, যা যা সে জীবনে জমিয়েছে, বেশির ভাগ বাজে বস্তাপচা জিনিস। সবারই ছোটবেলার সময়গুলোর গল্পে সত্য আর্ট ছিল। আমি চেয়ার টেনে বসি, চোখ বন্ধ করি, আর কানের গল্প শুনি। ১১টা কান, ১১টা পডকাস্টের মতন।
বিশ্বাস করেন, আমি ন্যায়বিচারক। প্রতিটি কান আমি রাতের পর রাত শুনেছি, খুঁজেছি, আসল কিছু পাই কি না। এক নম্বর বয়াম, রিল বানানো ইনফ্লুয়েন্সার মেয়েটা। ওর কানে তিন হাজার বার একই ভাইরাল গানের মিউজিক, ৩৩টা রিংটোনের মতো সুর, আর অন্যের শিল্প চুরি।
এরপরে সাহিত্য পেজ চালানো মেয়েটা, যে ইংরেজি লেখা বাংলা করে নিজের নামে ছাপে। ওর কানে খালি নোটিফিকেশনের টুংটাং, হাজারে হাজারে, শিলাবৃষ্টির মতো।
নকল, নকল, নকল। ১১টা গুদামে একটা আসল শব্দ নাই। কখনো নকল গান, কখনো নাচ, কখনো সস্তা কৌতুক, অভিনয় আর লাইফস্টাইল ভ্লগ।
[ad_2]
Source link